এনইআইআর (NEIR) বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হওয়া এবং মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক কমানো—এই দুই বড় পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরের সূচনা করেছে বাংলাদেশ সরকার। অবৈধ মোবাইল সেট বন্ধের এই উদ্যোগ (এনইআইআর) এবং শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত—উভয়ই সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এনইআইআর চালুর প্রতিবাদে আজ সারাদেশে মোবাইল দোকান বন্ধের মতো কর্মসূচিও পালন করছেন ব্যবসায়ীরা। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা জানবো এনইআইআর চালুর ফলে কী পরিবর্তন আসছে, শুল্ক কমানোর ফলে মোবাইলের দাম কতটা কমবে এবং কেন ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নেমেছেন।
এনইআইআর (NEIR) এখন কার্যকর: অবৈধ সেট বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর। এর ফলে অনিবন্ধিত বা অবৈধভাবে দেশে আসা মোবাইল হ্যান্ডসেট আর নেটওয়ার্কে সচল থাকতে না। বিটিআরসি (BTRC) আগেই জানিয়েছিল, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যবসায়ীদের স্টকে থাকা ফোনের আইএমইআই (IMEI) তথ্য জমা না দিলে ১ জানুয়ারি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, “বর্তমানে নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোনো হ্যান্ডসেট—সেটি নিবন্ধিত হোক বা অনিবন্ধিত—বন্ধ করা হবে না। তবে ১ জানুয়ারি থেকে যেসব নতুন সেট নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে, সেগুলো অবশ্যই যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে।”
কীভাবে বুঝবেন আপনার ফোনটি বৈধ কিনা?
গ্রাহকরা সহজেই তাদের হ্যান্ডসেটের বৈধতা যাচাই করতে পারেন। মেসেজ অপশনে গিয়ে KYD <Space> ১৫ ডিজিটের IMEI নম্বর লিখে ১৬০০২ নম্বরে পাঠালে ফিরতি মেসেজে জানা যাবে ফোনটি বৈধ কিনা।
স্বস্তির খবর: এক লাফে ১৫% কমলো মোবাইল ফোন আমদানির শুল্ক
এনইআইআর চালুর কড়াকড়ির মধ্যেই গ্রাহকদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছে অন্তবর্তী সরকার। বিদেশ থেকে মোবাইল ফোন আমদানির ওপর কাস্টমস ডিউটি এক ধাক্কায় ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক ব্রিফিংয়ে জানান, এর ফলে মোবাইল ফোন আমদানিতে মোট করের পরিমাণ ৬১.৮০ শতাংশ থেকে কমে ৪৩.৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে। শুধু তাই নয়, দেশে মোবাইল ফোন সংযোজন বা অ্যাসেম্বলিং শিল্পের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্কও ১০% থেকে কমিয়ে ৫% করা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মোবাইল ফোন আমদানির শুল্ক (Mobile Phone Import Duty) কমানোর ফলে বাজারে স্মার্টফোনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত গ্রাহকদের স্মার্টফোন কেনার সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও সুগম হবে।
বিক্ষোভে উত্তাল মোবাইল বাজার: দোকান বন্ধের ডাক

শুল্ক কমানোর খবরে যখন স্বস্তি, ঠিক তখনই এনইআইআর কার্যকর করার প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মোবাইল ব্যবসায়ীদের একাংশ। ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’ (এমবিসিবি)-এর ডাকে শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সারাদেশে মোবাইল ফোনের দোকানপাট বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
কেন এই প্রতিবাদ?
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এনইআইআর চালু করার আগে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা রক্ষা করা হয়নি। বিশেষ করে গ্রে-মার্কেট বা আনঅফিশিয়াল ফোনের বিশাল বাজার এবং এর সাথে জড়িত লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাদের। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিটিআরসি ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন ব্যবসায়ীরা। এসময় সামান্য ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হস্তক্ষেপ করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। কোনো বিকল্প না পেয়েই তারা দোকান বন্ধ রেখে শান্তিপূর্ণ কিন্তু কঠোর প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেটগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দেওয়া।
প্রবাসীদের জন্য ‘লাগেজ রুলস’ ও নতুন নিয়ম
এনইআইআর চালু হওয়ার ফলে বিদেশ থেকে দেশে আসা প্রবাসীরা কিছুটা উদ্বেগে ছিলেন। তবে বিটিআরসি স্পষ্ট করেছে যে, প্রবাসীরা তাদের ব্যবহারের জন্য সঙ্গে করে দুটি নতুন হ্যান্ডসেট শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনতে পারবেন। তবে দেশে আসার তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় দলিলাদি (পাসপোর্ট, এরাইভাল সিল ইত্যাদি) জমা দিয়ে সেই ফোনগুলো নিবন্ধন করে নিতে হবে। এর বেশি ফোন আনলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক প্রদান করতে হবে।
প্রযুক্তি বাজারে নতুন মোড়
একদিকে কঠোর নজরদারি, অন্যদিকে কর ছাড়—সরকারের এই ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ নীতি মোবাইল বাজারকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। অবৈধ ফোনের বাজার বন্ধ হলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাবে, তেমনি বৈধ আমদানিকারকরাও উপকৃত হবেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে বিটিআরসিকে আরও নমনীয় ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উপসংহার
এনইআইআর চালু ও কমলো মোবাইলের শুল্ক—এই দুটি সিদ্ধান্তই দেশের প্রযুক্তি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। গ্রাহকদের জন্য শুল্ক কমানো যেমন সুখবর, তেমনি অবৈধ সেট বন্ধে এনইআইআর-এর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে, মোবাইল ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের বিভ্রান্তি দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. এনইআইআর (NEIR) কী? ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) হলো এমন একটি সিস্টেম যার মাধ্যমে দেশে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের বৈধতা যাচাই করা হয় এবং অবৈধ ফোন নেটওয়ার্কে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২. মোবাইল ফোন আমদানির শুল্ক কত কমানো হয়েছে? বিদেশ থেকে মোবাইল ফোন আমদানির কাস্টমস ডিউটি ২৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে। ফলে মোট কর ৬১.৮০% থেকে কমে ৪৩.৪৩% হয়েছে। ৩. আমার ফোনটি বৈধ কিনা বুঝব কীভাবে? মেসেজ অপশনে গিয়ে KYD স্পেস ১৫ ডিজিটের IMEI নম্বর লিখে ১৬০০২ নম্বরে পাঠান। ফিরতি মেসেজে স্ট্যাটাস জানতে পারবেন।
তথ্যসূত্র (External References):
আরও পড়ুন: সত্যকন্ঠের সবশেষ খবর
কেন বাংলাদেশে এনইআইআর (NEIR) প্রযুক্তির বাস্তবায়ন জরুরি?
মোবাইল ফোনের নিরাপত্তা এবং রাজস্ব নিশ্চিত করতে এনইআইআর (NEIR) এর কোনো বিকল্প নেই। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধ করা সম্ভব হবে যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সফলভাবে এনইআইআর (NEIR) নিবন্ধনের টিপস
আপনার মোবাইলটি বৈধভাবে এনইআইআর (NEIR) সিস্টেমে নিবন্ধিত আছে কিনা তা নিয়মিত যাচাই করুন।
এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি এনইআইআর (NEIR) এবং মোবাইলের নতুন শুল্ক নীতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করতে।
আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের প্রযুক্তি বিভাগ ভিজিট করুন।
