
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি (NID) কার্ড ভুল নাম, উল্টাপাল্টা জন্ম তারিখ বা ঠিকানার কারণে এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) নিয়ে ঝামেলায় পড়েননি—এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই পাওয়া যাবে। পাসপোর্ট, ব্যাংক একাউন্ট, স্কুল-কলেজের ভর্তি থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তি—প্রতিটি ধাপে এখন স্মার্ট এনআইডি অপরিহার্য, আর তাই আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা ধাপে ধাপে জানাবো, কীভাবে অনলাইনে এনআইডি কার্ড সংশোধন করবেন, ফি কত এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কী কী।
কেন এনআইডি কার্ডের ভুল এখনই ঠিক করবেন
এনআইডি কার্ডের নাম, জন্ম তারিখ বা পিতামাতার নামের সামান্য ভুল ভবিষ্যতে পাসপোর্ট, ভিসা, চাকরি বা সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় বড় জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই “পরে করব” চিন্তা না করে অনলাইন মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব ভুল সংশোধন করে তথ্যগুলোকে একবারের জন্য সঠিক ও স্থায়ী করে নেওয়াই হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন উইং ইতোমধ্যে অনলাইন NID পোর্টালের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সংশোধনের ব্যবস্থা চালু করেছে, যার ফলে ঘরে বসেই আবেদন করে জেলা/থানা নির্বাচন অফিসে গিয়ে শুধু যাচাই ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করলেই হয়।
ডিজিটাল যুগে এনআইডি সংশোধনের গুরুত্ব
২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) তাদের সার্ভার এবং সেবা প্রদান পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এনআইডি কার্ডের তথ্য ভুল থাকলে সরকারি ও বেসরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে পাসপোর্ট এবং ভিসার আবেদনে এনআইডি ও জন্ম সনদের তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক। তাই, এনআইডি সংশোধন ২০২৬ প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা প্রত্যেক নাগরিকের জন্য জরুরি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: অনলাইনে আবেদনের সময় তথ্যের শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করুন। ভুল বা অসত্য তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে এবং আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এনআইডি কার্ডের নাম ও জন্ম তারিখ সংশোধনের অনলাইন পদ্ধতি

অনলাইনে সংশোধন প্রক্রিয়াটি এখন অনেক বেশি ইউজার-ফ্রেন্ডলি করা হয়েছে। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে আপনি সহজেই আবেদন করতে পারবেন:
ধাপ ১: রেজিস্ট্রেশন ও লগইন
প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট `services.nidw.gov.bd`-এ প্রবেশ করুন। আপনার যদি আগে অ্যাকাউন্ট না থাকে, তবে এনআইডি নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন। এরপর ফেস ভেরিফিকেশন (Face Verification) বা মোবাইল ওটিপি-এর মাধ্যমে লগইন করুন।
ধাপ ২: প্রোফাইল এডিট
লগইন করার পর ‘প্রোফাইল’ অপশনে যান। সেখানে ‘এডিট’ (Edit) বাটনে ক্লিক করলে আপনি নাম, জন্ম তারিখ, রক্তের গ্রুপসহ অন্যান্য তথ্য পরিবর্তনের অপশন পাবেন। আপনার কাঙ্ক্ষিত সঠিক তথ্যটি সেখানে টাইপ করুন।
ধাপ ৩: ফি জমা দেওয়া
তথ্য পরিবর্তনের পর আপনাকে নির্ধারিত ফি জমা দিতে হবে। বিকাশ, রকেট বা শিউরক্যাশের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সহজেই এনআইডি কার্ড সংশোধন ফি পরিশোধ করা যায়।
ধাপ ৪: কাগজপত্র আপলোড
ফি পরিশোধের পর আপনার সংশোধনের স্বপক্ষে প্রমাণাদি (যেমন: এসএসসি সনদ, জন্ম নিবন্ধন) স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে। মনে রাখবেন, পরিষ্কার বা স্ক্যান করা কপি না দিলে আবেদন ঝুলে থাকতে পারে।
ধাপ ৫: সাবমিট ও প্রিন্ট
সবকিছু ঠিক থাকলে ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করুন এবং প্রাপ্ত রসিদটি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন। এটি পরবর্তীতে স্ট্যাটাস চেক করতে কাজে লাগবে।
ভোটার আইডি কার্ড নাম সংশোধন করতে কি কি লাগে?
সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিন্নতা রয়েছে। সঠিক ডকুমেন্ট আপলোড না করলে আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ৯০%। নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:
- নিজের নাম সংশোধন: এসএসসি/এইচএসসি বা সমমানের সনদ, জন্ম নিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট (যদি থাকে), এবং নাগরিকত্ব সনদ।
- জন্ম তারিখ সংশোধন: এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার সনদ (যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে)। যাদের নেই, তাদের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা এমপিও শিট (চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে)।
- পিতা/মাতার নাম সংশোধন: পিতা বা মাতার এনআইডি কার্ডের কপি, এসএসসি সনদ, ভাই-বোনের এনআইডি কার্ডের কপি।
- স্বামী/স্ত্রীর নাম সংযোজন বা বিয়োজন: কাবিননামা বা নিকাহনামা, তালাকনামা (বিয়োজনের ক্ষেত্রে), স্বামী/স্ত্রীর এনআইডি কার্ড।
- ঠিকানা পরিবর্তন: ইউটিলিটি বিলের কপি (বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানি), বাড়ির ট্যাক্স রসিদ বা পৌরসভা/চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র।
এনআইডি কার্ড সংশোধন ফি কত?
২০২৬ সালে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফি এবং ভ্যাট সহ একটি স্বচ্ছ ধারণা নিচে তুলে ধরা হলো। মনে রাখবেন, এই ফি এর সাথে ১৫% ভ্যাট যুক্ত হবে।
| সংশোধনের ধরন | ফি (ভ্যাট ছাড়া) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| তথ্য সংশোধন (প্রথমবার) | ২৩০ টাকা | স্ট্যান্ডার্ড ফি |
| তথ্য সংশোধন (দ্বিতীয়বার) | ৩৪৫ টাকা | জরুরি প্রয়োজন হতে পারে |
| তথ্য সংশোধন (তৃতীয়বার/তদূর্ধ্ব) | ৫৭৫ টাকা | সর্বোচ্চ চার্জ |
| হারানো কার্ড পুনঃউত্তোলন (জরুরি) | ৩৪৫ টাকা | দ্রুত ডেলিভারির জন্য |
সূত্র: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ওয়েবসাইট
এনআইডি কার্ড সংশোধন করতে কতদিন লাগে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, এনআইডি কার্ড সংশোধন করতে কতদিন লাগে? এর কোনো সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্বাচন কমিশন অফিশিয়ালি ঘোষণা না করলেও, অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়:
- সাধারণ আবেদন: সাধারণত ১৫ থেকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়।
- ক্যাটাগরি ‘ক’ (সহজ সংশোধন): ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে হয়ে যেতে পারে।
- ক্যাটাগরি ‘গ’ (জটিল সংশোধন): যেমন জন্ম তারিখের আমূল পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন—এক্ষেত্রে তদন্তের প্রয়োজন হয় এবং ৩ মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
আপনার আবেদনের বর্তমান অবস্থা জানতে `services.nidw.gov.bd` থেকে লগইন করে বা ১০৫ নম্বরে কল করে স্ট্যাটাস চেক করতে পারেন।
কেন আপনার এনআইডি কার্ড সংশোধন আবেদন বাতিল হতে পারে?
আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশ কিছু সাধারণ ভুলের কারণে আবেদন রিজেক্ট বা বাতিল হয়। এগুলো এড়িয়ে চললে দ্রুত সমাধান পাওয়া সম্ভব:
১. অস্পষ্ট কাগজপত্র: মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে ঝাপসা ডকুমেন্ট আপলোড করা। অবশ্যই স্ক্যানার ব্যবহার করুন বা ক্যামস্ক্যানার (CamScanner) দিয়ে পরিষ্কার পিডিএফ তৈরি করুন।
২. তথ্যের গরমিল: আবেদনে যে তথ্য দিয়েছেন, সাপোর্টিং ডকুমেন্টে তার ভিন্নতা থাকা।
৩. যৌক্তিক কারণ না দর্শানো: কেন নাম বা বয়স পরিবর্তন করছেন, তার একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না দেওয়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: এনআইডি কার্ড সংশোধন ফরম কোথায় পাবো?
উত্তর: এখন আর অফলাইন বা হার্ডকপি ফরমের প্রয়োজন হয় না। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে অনলাইনে ফরম পূরণ করলেই হয়। তবে অফলাইনে করতে চাইলে উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে ফরম-২ সংগ্রহ করা যায়।
প্রশ্ন: How to check NID correction status?
উত্তর: আপনি ওয়েবসাইটে লগইন করে ড্যাশবোর্ড থেকে সহজেই স্ট্যাটাস দেখতে পারবেন।
প্রশ্ন: শিক্ষাগত যোগ্যতা সনদ ছাড়া কি জন্ম তারিখ সংশোধন সম্ভব?
উত্তর: এটি বেশ জটিল। তবে আপনার যদি পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা এমপিও কপি থাকে এবং বয়স সংশোধনের ব্যবধান কম হয়, তবে নির্বাচন কমিশন তা বিবেচনা করতে পারে। এক্ষেত্রে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এফিডেভিটও প্রয়োজন হতে পারে।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
* বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (NID Wing)
* বিবিসি নিউজ আর্কাইভ
* Shottokontho Research Team